ঢাকা ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাড়ে ৩ লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছিলেন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:২৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলন। রাজপথে মানববন্ধন, শোভাযাত্রা, সভা-সমাবেশ, স্মারকলিপি আর মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে স্বাক্ষর করেন প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ।

 

দীর্ঘ এই পথচলার শেষ প্রান্তে এসে ঠাকুরগাঁওবাসী দেখলেন সেই কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য—স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। তবে এই জায়গায় পৌঁছাতে সময় লেগেছে বছরের পর বছর। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জেলার মানুষের প্রত্যাশা, আন্দোলন, অপেক্ষা আর নিরলস প্রচেষ্টার ইতিহাস।

ঠাকুরগাঁওয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি অনেক পুরোনো। বিভিন্ন সময় এ দাবি উঠলেও ২০১৩ সালে তা সুসংগঠিত আন্দোলনের রূপ নেয়। ওই সময় ‘ঠাকুরগাঁও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে শুরু হয় ধারাবাহিক কর্মসূচি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধন ও অন্যান্য কর্মসূচিতে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, উত্তরাঞ্চলের পিছিয়ে থাকা এই জেলায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এরপর আন্দোলন আর থেমে থাকেনি। দাবি আদায়ে একের পর এক কর্মসূচি চলতে থাকে। মানুষের মধ্যে তৈরি করা হয় জনমত। গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, মানববন্ধন, শোভাযাত্রা ও স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিটি ছড়িয়ে পড়ে জেলার প্রত্যন্ত এলাকাতেও।

 

আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি ছিল গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনকারীরা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের এই স্বাক্ষর কেবল একটি দাবির সমর্থন ছিল না, এটি হয়ে ওঠে ঠাকুরগাঁওবাসীর সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার একটি বড় দলিল। শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, কৃষক থেকে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী থেকে পেশাজীবী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিটি তখন আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের দাবি থাকেনি; পরিণত হয় জেলার মানুষের সম্মিলিত দাবিতে। স্মারকলিপি দেওয়া হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে। চলতে থাকে সভা-সমাবেশ ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

 

দীর্ঘ আন্দোলনের পর আসে গুরুত্বপূর্ণ সেই মুহূর্ত। ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠাকুরগাঁওয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। দীর্ঘদিনের দাবির পর সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে তৈরি হয় নতুন আশার সঞ্চার। তবে ঘোষণা এলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শেষ হয়ে যায়নি। এরপর শুরু হয় বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া।

 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় ২০২২ সালে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২২’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরপর বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালে ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় আইন’-এর পথ আরও এগিয়ে যায়। ২০২৩ সালের ১২ জুন মন্ত্রিসভা ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৩’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। পরে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়। ২৯ অক্টোবর ২০২৩ জাতীয় সংসদে ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় বিল, ২০২৩’ পাস হয়। এরপর ১৩ নভেম্বর ২০২৩ গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে আইনটি কার্যকর হয়।

 

আইন পাসের পর বিশ্ববিদ্যালয়কে বাস্তব প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। ২০২৬ সালের ৭ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইস্রাফীলকে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রথম উপাচার্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে যায়। সদর উপজেলার মহেশালী এলাকায় প্রায় ৮৬ একর জমির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার কার্যক্রমও শুরু হয়। তবে তখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে ঠাকুরগাঁওবাসীর অপেক্ষা ছিল আরও একটি দৃশ্যমান অধ্যায়ের জন্য।

 

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই দিনও আসে। গত ৭ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার দিকে উৎসবমুখর পরিবেশে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে একসময় মানুষ রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, যে দাবির পক্ষে সংগ্রহ করা হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের স্বাক্ষর, যে দাবিতে দেওয়া হয়েছিল একের পর এক স্মারকলিপি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দৃশ্য এবার সরাসরি দেখলেন ঠাকুরগাঁওবাসী।

 

তবে এই গল্পের একটি বেদনাদায়ক দিকও আছে। যারা একসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন, সভা-সমাবেশ করেছেন তাদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। কেউ হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে। কিন্তু সেই দিনটি দেখার সুযোগ তাদের হয়নি।

 

আবার সেই আন্দোলনের অনেক সহযোদ্ধা এখনো বেঁচে আছেন। তাদের কেউ হয়তো বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, কেউ হয়তো আজও মনে করতে পারেন আন্দোলনের সেই দিনগুলোর কথা কোথায় মানববন্ধন হয়েছিল, কোথায় মিছিল হয়েছে, কীভাবে মানুষের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছিল।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন ঠাকুরগাঁওয়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে জড়ো হন। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন। যে জায়গায় একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক সূচনা দেখল মানুষ। তবে এই ভিত্তিপ্রস্তরই শেষ নয়, বরং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে আরও বড় কাজ স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা কার্যক্রম চালু, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি, গবেষণা এবং পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তোলা।

শিক্ষা কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোও এখনো নির্মাণাধীন পর্যায়ে। কিন্তু ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে ঠাকুরগাঁওবাসীর বহু বছরের স্বপ্ন আর কেবল কাগজে-কলমে নেই; তার একটি দৃশ্যমান ঠিকানা তৈরি হয়েছে মহেশালীর ৮৬ একর জমিতে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাড়ে ৩ লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছিলেন

আপডেট সময় : ০৭:২৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলন। রাজপথে মানববন্ধন, শোভাযাত্রা, সভা-সমাবেশ, স্মারকলিপি আর মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে স্বাক্ষর করেন প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ।

 

দীর্ঘ এই পথচলার শেষ প্রান্তে এসে ঠাকুরগাঁওবাসী দেখলেন সেই কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য—স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। তবে এই জায়গায় পৌঁছাতে সময় লেগেছে বছরের পর বছর। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জেলার মানুষের প্রত্যাশা, আন্দোলন, অপেক্ষা আর নিরলস প্রচেষ্টার ইতিহাস।

ঠাকুরগাঁওয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি অনেক পুরোনো। বিভিন্ন সময় এ দাবি উঠলেও ২০১৩ সালে তা সুসংগঠিত আন্দোলনের রূপ নেয়। ওই সময় ‘ঠাকুরগাঁও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে শুরু হয় ধারাবাহিক কর্মসূচি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধন ও অন্যান্য কর্মসূচিতে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, উত্তরাঞ্চলের পিছিয়ে থাকা এই জেলায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এরপর আন্দোলন আর থেমে থাকেনি। দাবি আদায়ে একের পর এক কর্মসূচি চলতে থাকে। মানুষের মধ্যে তৈরি করা হয় জনমত। গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, মানববন্ধন, শোভাযাত্রা ও স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিটি ছড়িয়ে পড়ে জেলার প্রত্যন্ত এলাকাতেও।

 

আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি ছিল গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনকারীরা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের এই স্বাক্ষর কেবল একটি দাবির সমর্থন ছিল না, এটি হয়ে ওঠে ঠাকুরগাঁওবাসীর সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার একটি বড় দলিল। শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, কৃষক থেকে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী থেকে পেশাজীবী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিটি তখন আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের দাবি থাকেনি; পরিণত হয় জেলার মানুষের সম্মিলিত দাবিতে। স্মারকলিপি দেওয়া হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে। চলতে থাকে সভা-সমাবেশ ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

 

দীর্ঘ আন্দোলনের পর আসে গুরুত্বপূর্ণ সেই মুহূর্ত। ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠাকুরগাঁওয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। দীর্ঘদিনের দাবির পর সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে তৈরি হয় নতুন আশার সঞ্চার। তবে ঘোষণা এলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শেষ হয়ে যায়নি। এরপর শুরু হয় বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া।

 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় ২০২২ সালে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২২’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরপর বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালে ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় আইন’-এর পথ আরও এগিয়ে যায়। ২০২৩ সালের ১২ জুন মন্ত্রিসভা ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৩’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। পরে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়। ২৯ অক্টোবর ২০২৩ জাতীয় সংসদে ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় বিল, ২০২৩’ পাস হয়। এরপর ১৩ নভেম্বর ২০২৩ গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে আইনটি কার্যকর হয়।

 

আইন পাসের পর বিশ্ববিদ্যালয়কে বাস্তব প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। ২০২৬ সালের ৭ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইস্রাফীলকে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রথম উপাচার্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে যায়। সদর উপজেলার মহেশালী এলাকায় প্রায় ৮৬ একর জমির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার কার্যক্রমও শুরু হয়। তবে তখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে ঠাকুরগাঁওবাসীর অপেক্ষা ছিল আরও একটি দৃশ্যমান অধ্যায়ের জন্য।

 

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই দিনও আসে। গত ৭ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার দিকে উৎসবমুখর পরিবেশে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে একসময় মানুষ রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, যে দাবির পক্ষে সংগ্রহ করা হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের স্বাক্ষর, যে দাবিতে দেওয়া হয়েছিল একের পর এক স্মারকলিপি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দৃশ্য এবার সরাসরি দেখলেন ঠাকুরগাঁওবাসী।

 

তবে এই গল্পের একটি বেদনাদায়ক দিকও আছে। যারা একসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন, সভা-সমাবেশ করেছেন তাদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। কেউ হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে। কিন্তু সেই দিনটি দেখার সুযোগ তাদের হয়নি।

 

আবার সেই আন্দোলনের অনেক সহযোদ্ধা এখনো বেঁচে আছেন। তাদের কেউ হয়তো বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, কেউ হয়তো আজও মনে করতে পারেন আন্দোলনের সেই দিনগুলোর কথা কোথায় মানববন্ধন হয়েছিল, কোথায় মিছিল হয়েছে, কীভাবে মানুষের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছিল।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন ঠাকুরগাঁওয়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে জড়ো হন। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন। যে জায়গায় একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক সূচনা দেখল মানুষ। তবে এই ভিত্তিপ্রস্তরই শেষ নয়, বরং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে আরও বড় কাজ স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা কার্যক্রম চালু, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি, গবেষণা এবং পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তোলা।

শিক্ষা কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোও এখনো নির্মাণাধীন পর্যায়ে। কিন্তু ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে ঠাকুরগাঁওবাসীর বহু বছরের স্বপ্ন আর কেবল কাগজে-কলমে নেই; তার একটি দৃশ্যমান ঠিকানা তৈরি হয়েছে মহেশালীর ৮৬ একর জমিতে।